বিদেশে গাড়ি চালানোর আগে তিনটি বিষয় যাচাই করুন: যে দেশে যাচ্ছেন সেখানে আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণযোগ্য কি না এবং সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিটও লাগবে কি না; ভাড়া কোম্পানি কী চায় (ন্যূনতম বয়স, জামানতের জন্য ক্রেডিট কার্ড এবং ভাড়ার সঙ্গে থাকা বিমা); আর কোন স্থানীয় ট্রাফিক নিয়ম আপনার দেশের চেয়ে আলাদা। নিয়ম দেশভেদে আলাদা এবং বদলাতেও পারে, তাই সবসময় সরকারি সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন, যেমন গন্তব্য দেশ ও আপনার নিজের দেশের সরকারি ওয়েবসাইট।
গাড়ি থাকলে ভ্রমণে অনেক স্বাধীনতা মেলে, নির্জন সৈকত থেকে শুরু করে বাস যায় না এমন ছোট গ্রাম পর্যন্ত। এই নির্দেশিকায় ভেবে দেখার মতো সাধারণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এটি আইনি পরামর্শ নয় এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের নিয়মের তালিকাও নয়।
আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স কি বিদেশে বৈধ?
এর একক কোনো উত্তর নেই। কিছু দেশ পর্যটকদের বিদেশি লাইসেন্স সীমিত সময়ের জন্য মেনে নেয়, কিছু দেশ কেবল অনুবাদ বা অতিরিক্ত নথির সঙ্গে মানে, আবার কিছু দেশ দীর্ঘ সময় থাকলে স্থানীয় লাইসেন্স চায়। আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য, তা নির্ভর করতে পারে কোন দেশ আপনার লাইসেন্স দিয়েছে, কোন দেশে যাচ্ছেন এবং কত দিন থাকবেন তার ওপর।
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র হলো আপনার সরকারের সরকারি ভ্রমণ পরামর্শের পাতা এবং গন্তব্য দেশের সরকারি পরিবহন বা সড়ক কর্তৃপক্ষ। সেই দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটও সাহায্য করতে পারে। ভাড়া কোম্পানিগুলোর আইনের বাইরেও নিজস্ব নিয়ম থাকে, তাই তাদের লাইসেন্স-সংক্রান্ত শর্তও পড়ুন। আসল লাইসেন্স সঙ্গে রাখুন, ভ্রমণের মধ্যে যেন মেয়াদ শেষ না হয় তা নিশ্চিত করুন, এবং লার্নার বা সম্প্রতি পাওয়া লাইসেন্স গ্রহণযোগ্য কি না দেখে নিন।
ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিট কী এবং আপনার কি এটি দরকার?
ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিট এমন একটি নথি যা আপনার লাইসেন্সকে কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করে। এটি নিজে কোনো লাইসেন্স নয়: শুধু আসল লাইসেন্সের সঙ্গেই এটি বৈধ, তাই দুটোই সঙ্গে রাখতে হয়। কিছু দেশে আইনত এটি বাধ্যতামূলক, কিছু দেশে শুধু সুপারিশ করা হয়, আর কিছু দেশে একেবারেই লাগে না।
এটি সাধারণত সেই দেশেই দেওয়া হয় যেখানে আপনি লাইসেন্স পেয়েছেন, প্রায়ই কোনো অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে, এবং সাধারণত রওনা হওয়ার আগে। কীভাবে আবেদন করবেন, খরচ কত এবং কত দিন বৈধ থাকে, তা নিজের দেশের সরকারি সংস্থা থেকে জেনে নিন। অনানুষ্ঠানিক "ইন্টারন্যাশনাল লাইসেন্স" বিক্রি করা ওয়েবসাইট থেকে সাবধান থাকুন, কারণ সেগুলো স্বীকৃত না-ও হতে পারে।
গাড়ি ভাড়া: বয়স, জামানত ও কাগজপত্র
ভাড়ার শর্ত প্রতিটি কোম্পানি নিজে ঠিক করে, এবং একই দেশের ভেতরেও তা আলাদা হতে পারে। বুকিংয়ের আগে শর্তগুলো পড়ুন এবং এই বিষয়গুলো দেখে নিন:
- বয়সসীমা। অনেক কোম্পানির ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত থাকে এবং কম বয়সী বা বেশি বয়সী চালকদের কাছ থেকে বাড়তি ফি নিতে পারে। কেউ কেউ ন্যূনতম কয়েক বছর ধরে লাইসেন্স থাকার শর্তও দেয়।
- জামানত ও পেমেন্ট কার্ড। জামানত প্রায়ই প্রধান চালকের নামের ক্রেডিট কার্ডে আটকে রাখা হয়। ডেবিট কার্ড সবসময় গ্রহণ করা হয় না, তাই আগে থেকে যাচাই করুন এবং যথেষ্ট ব্যবহারযোগ্য লিমিট আছে কি না নিশ্চিত হন।
- অতিরিক্ত চালক। চুক্তিতে যাঁদের নাম আছে শুধু তাঁরাই গাড়ি চালাতে পারবেন। পালা করে চালাতে চাইলে অন্য জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করুন।
- সীমান্ত পার ও ফেরি। গাড়ি অন্য দেশে নেওয়া বা ফেরিতে তোলা নিষিদ্ধ হতে পারে, অথবা অনুমতি ও অতিরিক্ত কভার লাগতে পারে।
- মাইলেজ ও বাড়তি সুবিধা। দূরত্ব সীমাহীন কি না, আর প্রয়োজন হলে শিশুর সিট, নেভিগেশন বা শীতের সরঞ্জামের খরচ কত, তা দেখে নিন।
ভাড়া গাড়ির বিমা কীভাবে কাজ করে?
বিমার শর্ত কোম্পানি ও দেশভেদে আলাদা, তবে মূল যুক্তি একই রকম। ভাড়ায় সাধারণত মৌলিক কভার থাকে, তবুও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা চুরি হলে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক দিতে হতে পারে। এই অঙ্ককে প্রায়ই এক্সেস বা ডিডাক্টিবল বলা হয়। ঐচ্ছিক বাড়তি কভার এই অঙ্ক কমাতে বা পুরোপুরি বাদ দিতে পারে, প্রায়ই দৈনিক ফির বিনিময়ে। টায়ার, কাচ বা গাড়ির নিচের অংশের মতো কিছু অংশ কভারের বাইরে থাকতে পারে।
বাড়তি কভার কেনার আগে দেখে নিন আপনার ভ্রমণ বিমা বা ক্রেডিট কার্ড আগে থেকেই কভার দেয় কি না, এবং তার শর্ত কী। কী বাদ পড়ে এবং দাবি জানাতে কী করতে হবে তা পড়ুন। যা পরিষ্কার নয়, সই করার আগেই জিজ্ঞেস করুন।
গাড়ি নেওয়া ও ফেরত দেওয়ার সময় কী যাচাই করবেন?
- গাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখুন। আঁচড়, টোল খাওয়া ও ফাটল খুঁজুন, এবং আগের সব ক্ষতি চুক্তিতে লেখা হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।
- ছবি ও ভিডিও তুলুন। বাইরের অংশ, ভেতর, চাকা, জ্বালানির মাত্রা ও মাইলেজ রেকর্ড করুন, সম্ভব হলে তারিখ ও সময় দেখা যায় এমনভাবে।
- জ্বালানি নীতি জেনে নিন। জিজ্ঞেস করুন গাড়ি পুরো ট্যাংক ভরে ফেরত দিতে হবে নাকি নেওয়ার সময়ের সমান মাত্রায়, এবং তা না করলে কী হবে।
- মৌলিক বিষয়গুলো জানুন। জিজ্ঞেস করুন জ্বালানির ঢাকনা কীভাবে খোলে, গাড়িতে কোন জ্বালানি লাগে, নিরাপত্তা সরঞ্জাম কোথায় আছে এবং সাহায্যের জন্য কোন নম্বরে ফোন করবেন।
- ফেরত দেওয়ার সময় আবার যাচাই করুন। নতুন ছবি তুলুন, শেষবার জ্বালানি ভরার রসিদ রেখে দিন এবং নতুন কোনো ক্ষতি ছাড়াই গাড়ি ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে লিখিত নিশ্চয়তা চান।
জামানত ফেরত না আসা এবং চূড়ান্ত বিল মিটে না যাওয়া পর্যন্ত চুক্তি ও ছবিগুলো রেখে দিন।
যে ট্রাফিক নিয়ম পর্যটকদের অবাক করতে পারে
অনেক মৌলিক নিয়ম সারা বিশ্বে প্রায় একই, তবে কিছু পার্থক্য আপনাকে অবাক করতে পারে। গাড়ি চালানোর আগে গন্তব্যের নিয়ম জেনে নিন এবং এই সাধারণ বিষয়গুলোতে নজর দিন:
- রাস্তার কোন দিক। কিছু দেশে গাড়ি বাঁ দিক দিয়ে চলে, কিছু দেশে ডান দিক দিয়ে। মোড়ে, গোলচত্বরে এবং পার্কিং থেকে বের হওয়ার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
- গতির একক ও সীমা। গতিসীমা কিলোমিটার বা মাইল প্রতি ঘণ্টায় দেখানো হতে পারে, এবং রাস্তার ধরন ও আবহাওয়া অনুযায়ী বদলাতে পারে।
- টোল সড়ক। কিছু মহাসড়ক, সেতু ও টানেলে টোল দিতে হয়, আর কিছু জায়গায় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা বা আগে থেকে কেনা স্টিকার লাগে।
- শহরের কেন্দ্রে সীমিত এলাকা। অনেক শহরের কেন্দ্রে কম নির্গমন বা সীমিত যান চলাচলের এলাকা থাকে, যেখানে ঢুকতে অনুমতি লাগতে পারে, আর ক্যামেরা প্রবেশকারী গাড়ি রেকর্ড করতে পারে।
- বাধ্যতামূলক সরঞ্জাম। কিছু দেশ গাড়িতে সতর্কতা ত্রিভুজ বা প্রতিফলক জ্যাকেটের মতো জিনিস রাখা বাধ্যতামূলক করে, অথবা হেডলাইট ও শীতের টায়ার নিয়ে নিয়ম রাখে।
চালকদের জন্য অ্যালকোহলের সীমাও দেশভেদে আলাদা, এবং কিছু জায়গায় তা আপনার ধারণার চেয়ে কম বা একেবারে শূন্য। সবচেয়ে নিরাপদ পথ সহজ: গাড়ি চালাতে হলে একেবারেই পান করবেন না।
ক্লান্তি, গাড়ি বিকল হওয়া ও দুর্ঘটনা
অচেনা রাস্তায় গাড়ি চালানো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্লান্তিকর, বিশেষ করে বিমানযাত্রার পর বা ভিন্ন টাইম জোনে। বাড়ির চেয়ে কম দূরত্বের পরিকল্পনা করুন, নিয়মিত বিরতি নিন এবং ঘুম পেলে থেমে বিশ্রাম নিন। ক্লান্ত অবস্থায় জোর করে চালিয়ে যাবেন না।
গাড়ি বিকল হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে আগে নিরাপদ জায়গায় যান, হ্যাজার্ড লাইট জ্বালান এবং বাধ্যতামূলক সতর্কতা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন। কেউ আহত বা বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে ফোন করুন। তারপর ভাড়া কোম্পানির সহায়তা লাইনে যোগাযোগ করুন, ছবি তুলুন, জড়িত অন্য গাড়িগুলোর তথ্য লিখে রাখুন এবং পুলিশ রিপোর্ট লাগবে কি না জিজ্ঞেস করুন। মেরামতে রাজি হবেন না এবং না বোঝা কোনো নথিতে সই করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব আপনার বিমা কোম্পানিকে জানান।
চালানো ও খরচ ভাগাভাগি
সঙ্গী থাকলে রোড ট্রিপ সহজ হতে পারে: পালা করে গাড়ি চালানো, পথ দেখা এবং জ্বালানি, টোল ও পার্কিংয়ের খরচ ভাগ করা যায়। mytripdate-এ আপনি দেখতে পারেন একই তারিখে একই শহরে আর কে থাকবেন এবং তাঁকে বার্তা পাঠাতে পারেন, যা একই রকম পরিকল্পনার কাউকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। আগে বার্তার মাধ্যমে পরিচিত হোন, যাচাই করা প্রোফাইল দেখুন, জনসমাগমের জায়গায় দেখা করুন এবং খরচ কীভাবে ভাগ হবে তা আগেই ঠিক করে নিন। ভাড়া গাড়ি যে-ই চালান, তাঁর নাম চুক্তিতে থাকতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন
আমি কি বিদেশে আমার সাধারণ লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালাতে পারব?
কখনো কখনো পারবেন, তবে তা নির্ভর করে দেশ, আপনার লাইসেন্স কোথায় দেওয়া হয়েছে এবং কত দিন থাকবেন তার ওপর। যাত্রার আগে গন্তব্যের সরকারি নিয়ম ও ভাড়া কোম্পানির শর্ত যাচাই করুন।
ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিট কি ড্রাইভিং লাইসেন্স?
না। এটি আপনার লাইসেন্সের অনুবাদ এবং শুধু আসল লাইসেন্সের সঙ্গেই বৈধ। গাড়ি চালানোর সময় দুটোই সঙ্গে রাখুন।
ক্রেডিট কার্ড ছাড়া কি গাড়ি ভাড়া নেওয়া যায়?
কিছু কোম্পানি অন্য পেমেন্ট পদ্ধতি গ্রহণ করে, তবে অনেকেই জামানতের জন্য প্রধান চালকের নামে ক্রেডিট কার্ড চায়। বুকিংয়ের আগে যাচাই করুন।