ভ্রমণে সুস্থ থাকা মূলত কয়েকটি সহজ অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে: রওনা দেওয়ার আগে আপনার গন্তব্যের জন্য পরামর্শ নিন, নিয়মিত যে ওষুধ খান তা ঠিকভাবে সঙ্গে নিন, খাবার ও পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, রোদ ও গরম থেকে নিজেকে রক্ষা করুন, একটি ছোট ফার্স্ট-এইড কিট গুছিয়ে নিন এবং নিশ্চিত হোন যে আপনার ভ্রমণ বিমা বিদেশে চিকিৎসার খরচ কভার করে। এর কোনোটাই জটিল নয়, আর সামান্য প্রস্তুতি পথের ছোটখাটো সমস্যা সামলানো অনেক সহজ করে দেয়।
এই গাইডে বেশিরভাগ ভ্রমণের জন্য প্রযোজ্য মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সুপারিশ নির্ভর করে আপনি কোথায় যাচ্ছেন, আপনার বয়স, স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনার ওপর, তাই আপনার নিজের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানতে ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট বা ট্রাভেল হেলথ ক্লিনিকের সঙ্গে কথা বলুন।
ভ্রমণের আগে কী যাচাই করবেন?
স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রতিটি গন্তব্যের জন্য আলাদা। কিছু দেশে সুপারিশকৃত বা বাধ্যতামূলক টিকা থাকে, কিছু অঞ্চলে মশাবাহিত রোগ আছে, আবার কিছু জায়গায় বড় শহরের বাইরে চিকিৎসাসেবা সীমিত। সবচেয়ে ভালো উৎস হলো আপনার ডাক্তার বা ট্রাভেল হেলথ ক্লিনিক এবং আপনি যে দেশে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে আপনার দেশের সরকার যে সরকারি ভ্রমণ-স্বাস্থ্য তথ্য প্রকাশ করে।
রওনার কয়েক সপ্তাহ আগে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করুন, কারণ কিছু টিকায় সময় লাগে বা একাধিকবার যেতে হয়। সঙ্গে নেওয়ার মতো কিছু কাজের প্রশ্ন:
- এই গন্তব্য ও আমার পরিকল্পনার জন্য কোন টিকাগুলো সুপারিশকৃত বা প্রয়োজনীয়?
- যেখানে যাচ্ছি সেখানে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আছে কি, আর কীভাবে নিজেকে রক্ষা করব?
- আমার বয়স, গর্ভাবস্থা বা কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কি কিছু জানা দরকার?
- ডাইভিং, উঁচু পাহাড়ে হাঁটা বা অন্য কঠিন কাজ করা কি আমার জন্য নিরাপদ?
নিয়মিত ওষুধ নিয়ে কীভাবে ভ্রমণ করবেন?
নিয়মিত ওষুধ খেলে পুরো ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট ওষুধ নিন, আর দেরির কথা ভেবে কয়েক দিনের বাড়তি। ওষুধ হ্যান্ড লাগেজে রাখুন, শুধু চেক-ইন ব্যাগে নয়, কারণ সেটা হারিয়ে যেতে পারে।
ওষুধ সঙ্গে নেওয়ার নিয়ম দেশভেদে আলাদা। আপনার দেশে সাধারণ কোনো ওষুধ অন্য কোথাও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে বা বিশেষ অনুমতি লাগতে পারে, বিশেষ করে কিছু শক্তিশালী ব্যথানাশক, ঘুমের ওষুধ এবং মনোযোগ বা উদ্বেগের ওষুধ। রওনার আগে গন্তব্য ও ট্রানজিট দেশগুলোর নিয়ম তাদের দূতাবাস বা সরকারি ওয়েবসাইটে যাচাই করে নিন। সাধারণভাবে এগুলো কাজে আসে:
- ওষুধ আসল মোড়কে রাখুন, লেবেল যেন দেখা যায়;
- প্রেসক্রিপশনের একটি কপি বা আপনার ওষুধের তালিকাসহ ডাক্তারের একটি চিঠি সঙ্গে রাখুন;
- ওষুধগুলোর জেনেরিক নাম লিখে রাখুন, কারণ বিদেশে ব্র্যান্ডের নাম প্রায়ই আলাদা হয়;
- যেসব ওষুধ ঠান্ডায় রাখতে হয় বা গরমে নষ্ট হতে পারে, সেগুলো কীভাবে রাখবেন জেনে নিন।
খাবার ও পানি: সহজ কিছু অভ্যাস যা কাজে দেয়
পেটের সমস্যা ভ্রমণের সবচেয়ে সাধারণ অসুবিধাগুলোর একটি। যেসব জায়গায় কলের পানি পানের জন্য নিরাপদ ধরা হয় না, সেখানে এই সাধারণ অভ্যাসগুলো ঝুঁকি কমায়:
- নিরাপদ পানি পান করুন। সিল করা বোতলের পানি বা ফোটানো অথবা ঠিকমতো পরিশোধিত পানি বেছে নিন, আর স্থানীয় পরামর্শ বললে দাঁত ব্রাশেও সেই পানি ব্যবহার করুন।
- বরফের কথা মাথায় রাখুন। বরফ কলের পানি দিয়ে বানানো হতে পারে, তাই নিশ্চিত না হলে বাদ দিন।
- সদ্য রান্না করা, গরম পরিবেশন করা খাবার খান। অনেকক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকা খাবারে ঝুঁকি বেশি।
- কাঁচা খাবারে সাবধান থাকুন। যে ফল আপনি নিজে খোসা ছাড়ান, তা সাধারণত কলের পানিতে ধোয়া সালাদের চেয়ে নিরাপদ।
- হাত ধুয়ে নিন। খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধুন, আর যেখানে বেসিন নেই তার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখুন।
ভিড়ওয়ালা খাবারের স্টল, যেখানে চোখের সামনে রান্না হয়, ভালো পছন্দ হতে পারে। তারপরও পেট খারাপ হলে বিশ্রাম নিন এবং তরল পান করতে থাকুন। উপসর্গ গুরুতর হলে, দু-তিন দিনের বেশি থাকলে বা উঁচু জ্বর বা রক্ত দেখা দিলে চিকিৎসা নিন, আর শিশু, বয়স্ক ভ্রমণকারী এবং যাদের কোনো অসুখ আছে তাদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকুন।
রোদ, গরম এবং পর্যাপ্ত পানি
রোদ ও গরম অনেক ভ্রমণকারীকে অবাক করে দেয়, বিশেষ করে প্রথম কয়েক দিনে। সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন এবং সাঁতার বা ঘামের পর আবার লাগান, টুপি ও সানগ্লাস পরুন, আর দুপুরের দিকে যখন রোদ সবচেয়ে কড়া, তখন ছায়ায় থাকুন। খুব তেষ্টা পাওয়ার আগেই নিয়মিত পানি পান করুন, আর মনে রাখবেন অ্যালকোহল ও রোদে দীর্ঘ সময় কাটানোর প্রভাব একসঙ্গে যোগ হয়। হাঁটা ও ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা সকাল ও সন্ধ্যার ঠান্ডা সময়ে করুন। গরমে আপনার বা আপনার সঙ্গীর মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, খুব দুর্বলতা দেখা দিলে বা ঘাম বন্ধ হয়ে গেলে ঠান্ডা জায়গায় যান এবং চিকিৎসা সহায়তা নিন।
একটি সহজ ট্রাভেল ফার্স্ট-এইড কিটে কী থাকা উচিত?
বেশিরভাগ ভ্রমণের জন্য একটি ছোট কিটই যথেষ্ট। বাকিটা সাধারণত স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। একটি কাজের মৌলিক কিটে থাকতে পারে:
- বিভিন্ন মাপের ব্যান্ডেজ প্লাস্টার ও ফোসকার প্লাস্টার;
- অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপ বা ক্রিম, জীবাণুমুক্ত গজ ও টেপ;
- যে ব্যথা বা জ্বরের ওষুধ আপনি সাধারণত ব্যবহার করেন;
- খাবার স্যালাইন (ওআরএস);
- মশা তাড়ানোর ক্রিম ও সানস্ক্রিন;
- চিমটা, ছোট কাঁচি (বিমানে গেলে চেক-ইন ব্যাগে) ও থার্মোমিটার;
- হ্যান্ড স্যানিটাইজার;
- আপনার ব্যক্তিগত ওষুধ ও সেগুলোর তালিকা।
আপনার জন্য কোনটা উপযুক্ত তা নিশ্চিত না হলে একজন ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুন, আর যা-ই সঙ্গে নিন, দরকার হওয়ার আগেই তার নির্দেশনা পড়ে রাখুন।
আপনার ভ্রমণ বিমা কি চিকিৎসা কভার করে?
বিদেশে চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল হতে পারে, আর দেশের স্বাস্থ্য কভারেজ অন্য দেশে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। কোনো পলিসি কেনার বা তার ওপর ভরসা করার আগে পড়ে নিন সেটি আসলে কী কভার করে:
- বিদেশে চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তি, এবং কত টাকা পর্যন্ত।
- জরুরি পরিবহন বা প্রয়োজনে চিকিৎসার কারণে দেশে ফেরা।
- আগে থেকে থাকা অসুখ: সেগুলো জানাতে হবে কি না।
- কার্যক্রম যেমন ডাইভিং, স্কিইং বা স্কুটার চালানো, যা যোগ না করলে প্রায়ই বাদ থাকে।
- দাবি করার নিয়ম: আগে বিমা কোম্পানিকে ফোন করতে হবে কি না, আর নিজে টাকা দিয়ে পরে ফেরত পাবেন কি না।
বিমা কোম্পানির জরুরি নম্বর ও আপনার পলিসি নম্বর ফোনে ও কাগজে সংরক্ষণ করুন, আর বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে শেয়ার করুন।
বিদেশে ডাক্তার বা ফার্মেসি কীভাবে খুঁজবেন?
ছোটখাটো সমস্যায় ফার্মেসি প্রায়ই সবচেয়ে ভালো প্রথম গন্তব্য; ফার্মাসিস্ট পরামর্শ দিতে পারেন এবং কখন ডাক্তার দেখানো দরকার তা বলতে পারেন। ডাক্তার খুঁজতে আপনি থাকার জায়গায় জিজ্ঞেস করতে পারেন, বিমা কোম্পানির সহায়তা লাইনে ফোন করতে পারেন, যারা প্রায়ই কোনো ক্লিনিকের খোঁজ দেয়, অথবা আপনার দূতাবাসের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন, কারণ কিছু দূতাবাস স্থানীয় ডাক্তারদের তালিকা প্রকাশ করে। অনুবাদ অ্যাপ উপসর্গ বোঝাতে সাহায্য করে, আর ওষুধের তালিকা তৈরি রাখলে সময় বাঁচে।
জরুরি নম্বর প্রতিটি দেশে আলাদা, তাই পৌঁছানোর আগেই গন্তব্যের নম্বরটি খুঁজে সংরক্ষণ করে রাখুন। কারও সঙ্গে ভ্রমণ করলে, যেমন mytripdate-এ পরিচয় হওয়া কোনো ভ্রমণসঙ্গীর সঙ্গে, একে অপরের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ ও বিমার তথ্য শেয়ার করে রাখা ভালো। mytripdate-এ আপনি দেখতে পারেন একই তারিখে একই শহরে কে থাকবেন, তাঁকে মেসেজ পাঠাতে পারেন এবং দেখা করার আগে প্রোফাইল যাচাইকৃত কি না তা দেখে নিতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভ্রমণের কত আগে স্বাস্থ্য পরামর্শ নেওয়া উচিত?
রওনার কয়েক সপ্তাহ আগে হলে ভালো, কারণ কিছু টিকা কাজ শুরু করতে সময় নেয় বা একাধিক ডোজ লাগে। শিগগিরই রওনা দিলেও জিজ্ঞেস করে নেওয়া লাভজনক।
আমার নিয়মিত ওষুধ কি অন্য দেশে নিয়ে যেতে পারব?
সাধারণত পারবেন, তবে নিয়ম আলাদা। গন্তব্যের সরকারি নিয়ম যাচাই করুন, ওষুধ আসল মোড়কে রাখুন এবং প্রেসক্রিপশন বা ডাক্তারের চিঠি সঙ্গে নিন।
সুস্থ থাকলেও কি ভ্রমণ বিমা দরকার?
দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুখ যে কারও হতে পারে, আর বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হতে পারে। এ কারণেই অনেক ভ্রমণকারী চিকিৎসা খরচসহ বিমা বেছে নেন।
বোতলের পানি কি সবসময় দরকার?
না। অনেক জায়গায় কলের পানি নিরাপদ। আপনার গন্তব্যের স্থানীয় ও সরকারি পরামর্শ মেনে চলুন, আর যেখানে কলের পানি পানের পরামর্শ দেওয়া হয় না সেখানে সিল করা বোতলের পানি বা পরিশোধিত পানি বেছে নিন।